* প্রধান বিচারপতির পর আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির পদত্যাগ * বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের পদত্যাগ * বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদত্যাগ * শাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ * রাজনৈতিক পরিচয়ধারী বিচারপতিদের পদত্যাগের দাবি জামায়াতের * ঢাবি উপাচার্যসহ সাত হলের প্রভোস্টের পদত্যাগপ্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিদের শনিবার দুপুর ১টার মধ্যে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও একই দাবিতে বিক্ষোভ করেন বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরাও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পদত্যাগ করেছেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন আশফাকুল ইসলাম। এছাড়াও আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি কাশেফা হোসেন পদত্যাগ করেছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবরে তাদের পদত্যাগপত্র পাঠানো হয়েছে। এর আগে গতকাল শনিবার সকালে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের সব বিচারপতিকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের দাবিতে হাইকোর্ট ঘেরাও করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এসময় অবস্থান নেয় হাজার হাজার আন্দোলনকারী। বিক্ষোভকারীদের কোনো রকম ধ্বংসাত্মক কাজে না জড়িয়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের বার্তা দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
গতকাল শনিবার দুপুরে তিনি আইন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আইন বিচারক ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। সচিবালয়ে নিজ দফতরে আইন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, পরবর্তী (প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ) প্রক্রিয়াটা হচ্ছে আইন উপদেষ্টা হিসেবে আমার স্বাক্ষরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দফতরে যাবে। তিনি এখন রংপুর বা সম্ভবত বিমানে আছেন, তিনি নামার পর তার সম্মতি সাপেক্ষে এটা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে। রাষ্ট্রপতি এটা গ্রহণ করলে কার্যকর হবে। এরপর নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।
কে হচ্ছেন নতুন প্রধান বিচারপতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা আমরা বলবো না, তবে একটা জিনিস বলবো, প্রধান উপদেষ্টার মতামত গ্রহণ করবো। কনসার্ন যারা আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলবো। আমার মন্ত্রণালয় থেকে যদি এ বিষয়ে কোনো ভূমিকা রাখার থাকে, চেষ্টা করবো সবচেয়ে যোগ্য, সৎ এবং নিরপেক্ষ একজন মানুষকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার। আন্দোলনকারী ছাত্রদের আপিল বিভাগের আরও কয়েকজন বিচারপতির পদত্যাগের দাবি ছিল-বিষয়ে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আপিল বিভাগের আরও যারা আছেন, তাদের পদত্যাগের দাবির কথা আমি শুনেছি। শুনেছি অন্যরাও পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এখনো পদত্যাগপত্র আইন মন্ত্রণালয়ে আসেনি।
অপরদিকে আপিল বিভাগের পাঁচজন বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন। তারা হলেনÑ বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি কাশেফা হোসেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবরে তাদের পদত্যাগপত্র পাঠানো হয়েছে। গতকাল শনিবার বিকেলে তাদের পদত্যাগপত্র পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের পদত্যাগের পর আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির পদত্যাগপত্র দেয়ার তথ্য জানা গেল। বিচারপতিদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলেছে, বিকেল চারটার দিকে দুই বিচারপতি পদত্যাগপত্র পাঠান।
এর আগে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিদের দুপুর ১টার মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় হাইকোর্ট চত্বরে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এ আল্টিমেটাম দেন। গতকাল শনিবার প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের বিচারপতিদের ফুল কোর্ট সভা ডাকা এবং পরে স্থগিত করার প্রতিক্রিয়ায় কথা বলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দুপুর ১টার মধ্যে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা পদত্যাগ না করলে তার পরিণতি হবে শেখ হাসিনার মতো। আমরা প্রধান বিচারপতিসহ দলবাজ বিচারপতিদের বাসভবন ঘেরাও করে পদত্যাগে বাধ্য করবো। দলবাজ বিচারপতিদের সরিয়ে দেয়ার মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদের মূল উৎপাটন করা হবে। হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও বলেন, জুডিসিয়ারি ক্যু করার পাঁয়তারা চলছে, অবশ্যই প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করতে হবে।
এদিকে প্রধান বিচারপতিসহ অন্যদের পদত্যাগের দাবিতে হাইকোর্ট অঙ্গনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ঢল নেমেছে। বেলা ১১টা থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হাইকোর্টে আসা শুরু করেছে। সকাল ১০টা ২০ মিনিট থেকে সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভে শতাধিক আইনজীবী অংশগ্রহণ করেন। বিক্ষোভ মিছিলটি সুপ্রিম কোর্টের মূলভবনসহ আপিল বিভাগের এলাকা প্রদক্ষিণ করেন। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে ফুল কোর্ট সভা ডেকে আবার স্থগিত করেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। গতকাল শনিবার সকালে সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট সভা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গতকাল শনিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়ে প্রধান বিচারপতির এ সভা ডাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ফ্যাসিবাদের মদদপুষ্ট ও নানান অপকর্মে জড়িত সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সরকারের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা না করে ফুল কোর্ট মিটিং ডেকেছেন। পরাজিত শক্তির যেকোনো প্রকার ষড়যন্ত্র বরদাশত করা হবে না। আইনজীবীরা এরই মধ্যে এর প্রতিবাদে জড়ো হয়েছেন। আমরা আগেই প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছিলাম। ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তাদের উস্কানি দিলে এর ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করতে হবে। অবিলম্বে বিনা শর্তে প্রধান বিচারপতি পদ থেকে পদত্যাগ করুন এবং ফুল কোর্ট মিটিং বন্ধ করুন।
এদিকে দেশের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম। গতকাল শনিবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গতকাল শনিবারের মধ্যে তারা সবাই রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন বলেও জানা গেছে।
এছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের রাজনৈতিক পরিচয়ধারী বিচারপতিদের পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার বিগত ১৬ বছর যাবৎ দেশের বিচার বিভাগে সুবিধাভোগী, অযোগ্য, অদক্ষ দলীয় লোক বসিয়ে বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মানুষের ন্যায়বিচার পাবার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। দেশের নাগরিকগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমানে দেশের আদালতগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না।
অপরদিকে বর্তমানে দেশে প্রধান বিচারপতিসহ পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার পদত্যাগ করেছেন। গত শুক্রবার দুপুরে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার বিকেল তিনটার দিকে গভর্নর এক পৃষ্ঠার পদত্যাগপত্রটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান খানের কাছে পাঠান। সেখানে তিনি পদত্যাগের জন্য ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা উল্লেখ করেন। জানা গেছে, নতুন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল শনিবার অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবের সঙ্গে বৈঠক করবেন। গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর আর বাংলাদেশ ব্যাংকে যাননি আলোচিত গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। একটি সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকে তার রাষ্ট্রীয় বাসভবন গভর্নর হাউজেও অবস্থান করছেন না। প্রধানমন্ত্রীর বা প্রধান উপদেষ্টার সম্মতিক্রমে গভর্নর নিয়োগ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তাই নিয়ম অনুযায়ী এই বিভাগের মাধ্যমেই তাকে পদত্যাগ করতে হয়। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে অস্থিরতা নিরসনে কার্যকরী ভূমিকা নিতে না পারায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন আব্দুর রউফ তালুকদার। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তিনি। এর প্রতিবাদে বাজেট সংবাদ সম্মেলনে গভর্নরকে বর্জন করেন সংবাদকর্মীরা। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছেন ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

ছাত্র আন্দোলন
এবার পদত্যাগ করলেন প্রধান বিচারপতি


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ